মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত যেভাবে ইজরাইলকে সুবিধা দিচ্ছে

May 10, 2026 - 21:27
May 10, 2026 - 22:20
 0  8
মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত যেভাবে ইজরাইলকে সুবিধা দিচ্ছে

।। আব্দুল্লাহ আল মামুন

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে। সৌদি আরব ও কাতার নতুন করে আমেরিকাকে তাদের কোস্টাল এরিয়া ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারো জটিল হয়ে উঠেছে। এর ফলে চলমান সংঘাত আবারো জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ রণতরি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করাকেও অনেক বিশ্লেষক একধরণের “গেম চেঞ্জিং” ঘটনা হিসেবে দেখছেন। কারণ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার একাধিকবার ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সংঘাতে জড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন “এটা আমাদের যুদ্ধ নয়” বলে। সেই ব্রিটেন যখন হরমুজে প্রবেশ করল, তখন থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলোও হঠাৎ করেই হরমুজ ও পারস্য উপসাগর নিয়ে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

ফ্রান্স তাদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রণতরি “চার্লস দ্যা গল” হরমুজ অভিমুখে পাঠিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেটিও ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগরে পৌঁছে গেছে। একই সময়ে জার্মানির চ্যান্সেলর নতুন করে আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের স্বক্রিয়তার গুরুত্বের কথা বলেছেন। অথচ এর মাত্র কিছুদিন আগেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রতিনিধিকে আমেরিকাকে বাদ দিয়ে নতুন প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে আলোচনা করতে দেখা গিয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো একত্রে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে- ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় দেশগুলোকে কীসের বিনিময়ে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে যুক্ত করতে সক্ষম হলেন?

ঘটনাগুলোকে যদি ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়, তাহলে চিত্রটি দাঁড়ায় এমন-

ক. ব্রিটিশরা হরমুজে প্রবেশ করেছে।

খ. ফ্রান্স রণতরি পাঠিয়েছে।

গ. সৌদি ও কাতার আবারও আমেরিকাকে ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।

ঘ. আমেরিকা ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আগের ১০০০০ সৈন্যের সাথে আরো ৫ হাজার সৈন্য ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ করেছে।

ঘ. জার্মানির নেতৃত্বে ইউরোপের অন্যান্য দেশ ট্রাম্পের অবস্থানের সাথে সুর মিলাচ্ছে।

এবং

ঙ. চীন ও রাশিয়া যে কোনো অবস্থায় ইরানের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে।

ইজরায়েলের কৌশল ও লক্ষ্য

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে- ইজরায়েল কী করছে এবং কী চায়?

ইজরায়েল ইরানে স্থলসৈন্য পাঠানোর বিষয়ে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু একই সময়ে ইরান ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট বৈশ্বিক উত্তেজনার সুযোগে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। নতুন নতুন এলাকা দখল করা হচ্ছে, গাজার ধ্বংসস্তূপে সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রে ইতোমধ্যে খান ইউনূস ও আশেপাশের এলাকায় একাধিক সামরিক স্থাপনার উপস্থিতি দেখা গেছে।

শুধু গাজাই নয়, লেবাননেও ইজরায়েলি বাহিনী দখলদারি মনোভাব নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাড়িঘর ধ্বংস, সাধারণ মানুষের মৃত্যু এবং কৃষিজমিতে হোয়াইট ফসফরাসের মতো নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইজরায়েল পশ্চিম তীরকেও গাজার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের দৃষ্টি যখন হরমুজ প্রণালি ও ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার দিকে, তখন পশ্চিম তীরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এই সুযোগে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ, বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস এবং আহতদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত করার মতো ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এক অর্থে বলা যায়, নেতানিয়াহু পূর্বে ঘোষিত “সম্পূর্ণ ফিলিস্তিন থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়ন” পরিকল্পনার বাস্তবায়নের পথে আরও একধাপ এগোচ্ছেন। অনেকের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আঞ্চলিক সংঘাত ইজরায়েলের জন্য এই আগ্রাসী ভূরাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে।

সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

বর্তমান পরিস্থিতিকে দুইটি বড় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।

১. তেল ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই

যদি ধরে নেওয়া হয় যে ইউরোপ ও আমেরিকা একজোট হয়ে ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে চায়, তবে এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দুর্বল করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের উপর পশ্চিমা আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা হতে পারে। এর সাথে সৌদি আরবের “পেট্রো ডলার” চুক্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও জড়িয়ে আছে, যার মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে এবং যা নতুন করে নবায়ন হয়নি বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা ও ন্যাটো জোট চীন ও রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার নতুন সুযোগ পেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

২. বৃহত্তর ইজরায়েল ধারণা

অন্যদিকে ইজরায়েল এই অস্থিরতাকে নিজেদের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।

সিরিয়া, লেবানন কিংবা ফিলিস্তিন— সব ক্ষেত্রেই ইজরায়েলের সামরিক উপস্থিতি ও দখলদারি প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকে মনে করেন, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানের সাথে সংঘাতে জড়াতে উৎসাহিত করার মাধ্যমে বৃহত্তর ইজরায়েল গঠনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়নের পথ তৈরি করছেন।

নতুন সামরিক জোট ও বৈশ্বিক শঙ্কা

বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন নতুন সামরিক সমীকরণও তৈরি হচ্ছে।

তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত একটি সামরিক জোট ইতোমধ্যে সক্রিয় রয়েছে, যার প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক গত মাসে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, ভারত, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মধ্যেও একধরণের কৌশলগত সামরিক সখ্যতা তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে চীন।

এই অবস্থায় যদি আমেরিকা-ব্রিটেন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট এবং চীনের নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যুগে এমন যুদ্ধের পরিণতি হতে পারে ধ্বংসাত্মক। চীনের সাথে আমেরিকার অসম বাণিজ্য যুদ্ধ তারই ইঙ্গিত দেয় কি?

কে লাভবান হবে?

সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম বাস্তবতা সামনে চলে আসে- মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতের মধ্যেও ইজরায়েল তুলনামূলকভাবে কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সারা বিশ্ব যখন ইরান ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে ব্যস্ত ইজরায়েল তখন যে কোন ধরণের আন্তর্জাতিক চাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে তার আগ্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে

বিশ্ব যখন ইরান, হরমুজ প্রণালি এবং বৈশ্বিক শক্তির সংঘাতে ব্যস্ত, তখন ফিলিস্তিন ও আরব ভূখণ্ডে ইজরায়েলের আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতা ইজরায়েলের জন্য এমন এক সুযোগ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে আরও এগিয়ে যাচ্ছে।।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0