হাজীগঞ্জে বালু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে নদীগর্ভে বিলীন কৃষিজমি
হাজীগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়া নদী পাড়ের কৃষিজমি আজ অস্তিত্ব সংকটে। গুটিকয়েক বেপরোয়া বালু ব্যবসায়ীর দৌরাত্ম্যে ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শত শত শতাংশ ফসলি জমি। প্রতিদিন অব্যাহত নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষকের ভিটেমাটি, নিঃস্ব হয়ে পড়ছে পরিবারগুলো।
বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের এন্নাতলী এলাকার কৃষকরা বলছেন, একসময় যেখানে ধান, শসা, বাঙ্গি ও সবজির সমারোহ ছিল, সেখানে আজ শুধু হাহাকার। নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত এন্নাতলী কৃষি মাঠে এখন শুধুমাত্র ইরি-বোরো ধানের চাষাবাদই কোনো রকমে টিকে আছে।
গত কয়েক বছরে নদীর দুই পাড়ে বিশেষ করে উত্তর পাড়ের আলীগঞ্জ এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক বালুমহাল। এসব মহাল থেকে ট্রলারযোগে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। নদীর পশ্চিম পাড়ে ট্রলারের ঘূর্ণিপাকে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
চলতি বছর নদীর ভাঙনে এন্নাতলী মাঠের একমাত্র সেচ পাম্পটি পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। কৃষকদের ক্ষোভে বাধ্য হয়ে বালু ব্যবসায়ীরা পরে নতুন পাম্প বসালেও ক্ষতির মাত্রা এর চেয়েও ভয়াবহ। এক হাজার শতাংশেরও বেশি জমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ড্রেজার স্থাপন এবং বালু পরিবহনকে কেন্দ্র করে নদীর পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর তলদেশের মাটি ক্ষয়ে ঘোলাটে হয়ে পড়েছে পানি, ফলে সূর্যের আলো নদীর তলদেশে পৌঁছাতে পারছে না। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ প্রাণির জীবনচক্র, মাছের প্রজনন হ্রাস পাচ্ছে, নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকিতে।
এদিকে, উপজেলা ভূমি অফিস নিজেও এখন নদীভাঙনের মুখে। পুরনো ভবনটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, তারা এতদিন চুপ ছিলেন প্রভাবশালীদের ভয়ে। তবে সরকারের পরিবর্তনের পর সাহস করে মুখ খুলছেন তারা। গত ৪ এপ্রিল তারা বালু ব্যবসায়ী কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠকে বসে ড্রেজার সরানোর দাবি জানান। কিন্তু এখনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা গণস্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছেন।
একই বৈঠকে জানানো হয়, হুমায়ুন পাটওয়ারী, বিল্লাল পাটওয়ারী, রশিদ বেপারী, আউয়াল মিয়াজীসহ অন্তত ২০ জনের অধিক কৃষকের জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।
ক্ষোভে ফেটে পড়া এক স্থানীয় শিক্ষক তাজুল ইসলাম জানান, "এ চর এক ফসলি এলাকা। এখানকার ফসল দিয়েই অনেক পরিবার চলে। আজ আমরা জমি হারিয়ে নিঃস্ব, আর বালু ব্যবসায়ীরা কোটিপতি।"
অন্যদিকে বালু ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, “আমার জমিতেই বালুমহাল করেছি, এখানে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে। আমি একা না, আরও অনেকে এখানে ব্যবসা করছেন। সবাইকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত জাহান জানান, “বালু মহালের ইজারা দেওয়া হয়েছে ঠিকই, তবে নদীতে ড্রেজার স্থাপন বা ট্রলার রাখার জন্য কোনো বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বলেন, “অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0
